১
মোবাইল অ্যালার্মের কর্কশ কিন্তু কার্যকর আওয়াজে ঘুম ভাঙল ঋভুর। তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখে ইতি উতি তাকিয়ে শেষপর্যন্ত বালিশের তলা থেকে ফোনটা উদ্ধার করে অ্যালার্ম অফ করল ও। দুধসাদা হালকা সাইজের একটা লেপ গায়ের ওপর। বরাবরের মত মৌ নিশ্চয়ই লেপটা চড়িয়ে দিয়ে গেছে। কারণ ঘুমালে ঋভুর জামাকাপড়েরই ঠিক থাকে না, সেখানে এটা তো লেপ মাত্র।
চোখ কচলাতে কচলাতে শেষপর্যন্ত নরম বিছানার মায়া ত্যাগ করে উঠে পড়ল ও। ঘড়ি আগেই দেখে নিয়েছে। সকাল ১০.৩০। দুইটার দিকে অফিসে সাপ্তাহিক মীটিং। বেশ খানিকটা সময় আছে হাতে। এখন আগে ফ্রেশ হতে হবে...
ডাইনিং টেবিলে সুন্দর করে খাবার সাজানো। ঢেকে রাখা। পাশে ছোট্ট একটা চিরকুট। মুক্তোর মত অক্ষরে তাতে কিছু কথা লেখা –
“একটা ভয়েসওভারের কাজ আছে। ওটা শেষ করে অফিসে যেতে হবে। তাই আগেই বের হয়ে গেলাম। ঠিক মত খেয়ে নিয়ো। ভালোবাসা।”
চিরকুটটা হাতে নিয়ে ব্রেকফাস্ট করতে করতে প্রতিদিনকার মত করে ঋভু ভাবছে, এই মেয়েটা না থাকলে যে কি হত জীবনে !! পুরা ডিজাস্টার...
ঋভু ও মৌ প্রেম করে বিয়ে করেছে এক বছরও হয়নি। নিজেদের মধ্যকার বোঝাপড়াটা বেশ ভালো। তাই সুখ শান্তি লেগে আছে ছোট্ট সংসারটায়।
ঋভু একটা কর্পোরেট কোম্পানিতে কাজ করছে বছর চারেক হল। আর মৌ একটা এফএম রেডিওতে কাজ করছে কথাবন্ধু হিসেবে বছর তিনেক। চূড়ান্ত ব্যস্ততার মাঝেও কিভাবে যেন নিজেদের জন্য সময় বের করে ফেলে ওরা। তবে সে গপ্পো পরে হবে। আপাতত ঋভুর শাওয়ার শেষ। এবার রেডি হবার পালা। বহুদূর যেতে হবে তো...
ধীরে সুস্থে রেডি হয়ে ব্যাগ কাঁধে নিল ঋভু। অভ্যাসবশত চেক করে নিচ্ছে সবকিছু। পকেটে চাপড় দিচ্ছে আর বিড়বিড় করছে, “মোবাইল, মানিব্যাগ, রুমাল, চাবি, পেনড্রাইভ, লাইটার, অফিসের পেপারস আর আমি ! হু !! সব নিয়েছি...”
বেরিয়ে পড়ল ও।
২
এই নিয়ে সপ্তমবার একই ভয়েস দিচ্ছে মৌ। একই ভয়েস মানে একই স্ক্রিপ্টের ভয়েসওভার। এবং টানা। কারণটা হচ্ছে সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার পারফেক্ট কাজ না হলে সন্তুষ্ট হন না...
“সবই ঠিক আছে, জাস্ট ওই প্যারাটা আরেকবার দিতে পারবেন একটু? ওখানে ইমোশন একটু কম হয়ে গেছে... অথবা, এই শব্দের উচ্চারণটা ঠিক ক্লিয়ার না আপু, আরেকবার দিলে... অথবা, আরেকটু ভেতর থেকে আপু, গলার ভেতর থেকে বলতে হবে কথাগুলো...” – এই চলছে গত আধা ঘণ্টা ধরে।
শেষপর্যন্ত মোটামুটি একটা পারফেক্ট অবস্থায় আসার পর মুক্তি পেল মৌ। হাফ ছেড়ে বাঁচার মত অবস্থা। তবে এখনও শান্তি নেই। এবার দৌড়াতে হবে অফিসে। বিকালে প্রোগ্রাম। কিন্তু কিছু কাজ আছে। স্টুডিও থেকে বের হয়েই একটা রিকশা পেয়ে গেল মৌ। গন্তব্য অফিস।
অফিস বিল্ডিঙটার কাছেই একটা বাসস্ট্যান্ড। সেই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষের ভিড়ভাট্টা লেগেই থাকে সেখানে। আর বোনাস হিসেবে আছে হকারদের ছোট্ট ছোট্ট দোকান প্লাস হরেক রকম পসরা। কানের দুল থেকে শুরু করে মানিব্যাগ, সবই মেলে বেশ কমদামে। মৌ মাঝে মাঝে টুকিটাকি জিনিসের দামদর করে দোকানগুলোতে। ব্যাট বলে মিলে গেলে কিনে ফেলে, নয়ত না। আজ রিকশায় ওখান দিয়ে আসতে আসতে হঠাৎ নেমে গেল ও। চোখ পড়েছে মানিব্যাগওয়ালার দিকে...
ঋভুর মানিব্যাগটা একটু বড়সড়। পাক্কা চৌকোণা। কালো রঙ। সিম্পল কয়েকটা পকেটওয়ালা।
একদম ওরকম একটা মানিব্যাগ দেখতে পেয়ে ও সেটা হাতে তুলে নিল। ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখে একটু দামদরের পর কিনে ফেলল মানিব্যাগটা। তারপর নিজের ভ্যানিটি ব্যাগে ওটা ফেলে সোজা অফিসে পানে রওনা হল।
পরে ভাবা যাবে এটার কথা। এখন অফিস টাইম। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। দেরি হলে সর্বনাশ !!
৩
ঋভুর কোম্পানিটা মূলত বেশ পুরনো। তবে কিছুদিন হল একটা নতুন উইং খোলা হয়েছে এটার। ইন হাউজ অ্যাড এজেন্সি। কোম্পানির নিজস্ব বিজ্ঞাপনের কাজ করার পাশাপাশি বাইরের কাজও করবে এই উইং। আর তরুণ, অভিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত লোক হিসেবে গত মাস থেকে ঋভুকে এই উইংয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। একে তো নতুন উইং, তারওপর অফিস ইকুইপমেন্ট সব আসি আসি করছে কিন্তু এখনও এসে পৌঁছায়নি। তাই একটু দেরি করে, অর্থাৎ মোটামুটি এগারোটার দিকে অফিসে আসে ঋভু। আজকের ব্যাপারটা অবশ্য আলাদা। সাপ্তাহিক মীটিং। তাও দুপুরে লাঞ্চের পর। তাই বাসা থেকে ধীরে সুস্থেই রওনা হয়েছে ও...
হালকা জ্যাম ঠেলে মোটামুটি সময়মতই অফিসে পৌঁছে গেল ঋভু। পুরো অফিসটা মূলত ওপেন স্পেস। চারকোণা করে খোপ খোপ করা।
নিজের ডেস্কে ব্যাগ রেখে রেস্টরুমে গেল ঋভু। একটু ফ্রেশ হয়ে নিয়ে আবার ফিরে এলো ডেস্কে। কম্পিউটারের পাশেই নোটবুকটা রাখা। প্রতিদিনকার কাজের একটা সারাংশ ওখানে লিখে রাখে ও। যাতে ভুলে না যায়। নোটবুকটা খুলে দেখল যে মীটিংয়ের জন্য কি কি পেপারস দরকার ওর। হাতের কাছেই সব গুছিয়ে রেখেছিল, তাই খুঁজে পেতে কোন সমস্যা হল না।
মীটিং শুরু হতে এখনও আধা ঘণ্টা বাকি। কি করা যায় কি করা যায়, ভাবতে ভাবতেই ওর ইচ্ছে হল কফি খাবে...
ব্যাগে খোঁজা শুরু হল। তেমন একটা কফি খায় না ও কিন্তু গত পরশু দুটো মিনিপ্যাক ইনস্ট্যান্ট কফি কিনেছিল। যে ব্র্যান্ডের কফি মৌ খায়, ওই একই ব্র্যান্ডের।
“ব্যাগেই তো থাকার কথা... গেল কই...
এইতো পাওয়া গেছে... !!”
একটা প্যাক নিয়ে রওনা হল ও কিচেনের দিকে।
কাপে কফি ঢালতে ঢালতে ম্যাসেঞ্জার চেক করল।
হুম, মৌ ইজ অনলাইন।
“এক কাজ করা যাক, টেক্সট না করে কল দেই বরং...”
ভাবল ও।
এবং দিল কল।
বার দুয়েক রিং হবার পর রিসিভড হল কলটা। ওপারে মৌয়ের মিষ্টি প্রলম্বিত স্নিগ্ধ কণ্ঠ...
- হ্যাঁ, বল?
- কি কর তুমি?
- অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করলাম একটা। এখন বসা। তুমি কি কর? খাইছ ঠিকমত? অফিসে গেছ...?
- হুমম... খাইছি ঠিকমত। একটু আগে অফিসে আসলাম। আধা ঘণ্টা পর মীটিং... আচ্ছা শোন, তুমি যে কফি খাও, কয় চামচ চিনি দাও?
- ক্যান !? হঠাৎ কফি?
- আগে বল... দেন বলতেছি...
- ২ চামচ চিনি দেই... এবার বল কাহিনী কি? আচমকা এই কথা ক্যান?
- পরশু দিন কফি কিনছিলাম বুঝছ? তুমি যেটা খাও ওইটা... ব্যাগেই ছিল। আজকে ইচ্ছা করতেছে তুমি যেমনে খাও অমনে কফি খাইতে... ওই সেম পরিমাণ চিনি দিয়ে। তাই জিগ্যেস করলাম...
- তা মশাইয়ের এই ইচ্ছা ক্যান জাগল হঠাৎ?
প্রশ্নটা শুনে একটুক্ষণের জন্য থেমে গেল ঋভু। কেন ইচ্ছেটা হয়েছে আজ? কি উত্তর হবে? ওদিকে মৌ সাড়া শব্দ না পেয়ে হ্যালো হ্যালো করে যাচ্ছে... মনের গভীরে ডুব দিল ঋভু। উত্তরও ধরা দিল মুহূর্তে।
খুব মিস করছে ও মেয়েটাকে। খুব। কিন্তু কর্মক্ষেত্রের প্রেশারে এখন তারা একটু দূরে। তাই মিস করাটা দূর করার জন্য মেয়েটার প্রিয় কফি তার মত করেই খেতে চাচ্ছে ও...
সম্বিত ফিরে পেয়ে মৌয়ের হ্যালোর জবাব দিল সে...
- তোমাকে খুব মিস করছি তো...। তাই তোমার মত করে কফি বানিয়ে খেতে খেতে তোমাকে অনুভব করছি... এই কফিতে যে তুমিও মিশে আছো... !!
৪
হুড়মুড়িয়ে অফিসে ঢুকতেই “একদম পড়বি তো পড় মালির ঘাড়ে”, মানে বসের সামনে গিয়ে পড়ল মৌ। গ্লাস ডোর ঠেলে মৌ ভেতরে ঢুকছে আর বস লাউঞ্জের দিকে যাচ্ছেন। মুখোমুখি সিচুয়েশন... (বসকে ভাইয়া বলে ডাকে সবাই)
মৌকে দেখেই বস থমকে দাঁড়ালেন এবং জেরা শুরু –
- কই ছিলেন এতক্ষণ?
- এইতো ভাইয়া, নিচে ছিলাম... কেন ভাইয়া?
- নিচে ছিলাম মানে? অফিস কি নিচে নাকি ওপরে?
- না ভাইয়া মানে কেবল আসলাম আর কি...
- কয়টা বাজে? আপনার প্রোগ্রাম কখন?
- দেরি আছে ভাইয়া... অনেক টাইম বাকি...
- তাতে কি? প্রোগ্রাম করতে প্রিপারেশন লাগে না?
- তাতো লাগেই ভাইয়া... এইতো এখন ঠিকঠাক করব সবকিছু...
- আচ্ছা যান... একটা কাজ আছে, ওটা আগে করে আমাকে সাবমিট করেন... তাড়াতাড়ি।
- জি ভাইয়া !!
বস লাউঞ্জে ঢুকে গেলেন। হাফ ছেড়ে বাঁচল মৌ। আজকে কোন একটা কারণে ভাইয়ের গিয়ার গরম। কাহিনী কি, কে জানে? যাই হোক, আগে কাজ শেষ করা যাক, পরে অন্যকিছু...
ফ্রেশ হয়ে, অভ্যাস মোতাবেক কফির কাপ হাতে নিয়ে ডিউটি প্রোডিউসারের সাথে বসলো মৌ। ব্রিফিং নিতে। কাজ তেমন কিছু না। পঞ্চাশটার মত লাভ সংয়ের একটা লিস্ট বানাতে হবে। কি যেন ব্র্যান্ডিং হবে... সেটার জন্য।
কফি শেষ করে কম্পিউটারে বসে পড়ল ও। হাতের কাজ জমিয়ে রাখতে নেই। শেষ করে ফেললে তো প্রেশার গন...
কাজের মধ্যে হঠাৎ ম্যাসেঞ্জারে কল। ঋভু।
ঘড়ি দেখল মৌ। “এই সময়ে কল...!” ভাবল ও। “ওর তো অফিসে মীটিংয়ে থাকার কথা এখন, ব্যাপার কি...!”
ভাবতে ভাবতেই কলটা রিসিভ করল ও। কানে ঠেকাল...
সাহেবের মীটিং আরও আধা ঘণ্টা পর শুরু হবে। উনার হঠাৎ ইচ্ছে জেগেছে কফি খাওয়ার। আর এটা জানার জন্য সে কল করেছে যে মৌ কফিতে কয় চামচ চিনি দেয়... !!
প্রশ্ন শুনে মৌ কিছুটা অবাক হলেও উত্তর দিল। পরক্ষণেই জানতে চাইল যে এ প্রশ্নের হেতু কি?
ঋভুর দেয়া জবাব কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন বরফের মত জমিয়ে ফেলল মৌকে...
“তোমাকে খুব মিস করছি তো...। তাই তোমার মত করে কফি বানিয়ে খেতে খেতে তোমাকে অনুভব করছি... এই কফিতে যে তুমিও মিশে আছো... !!”
যন্ত্রচালিত পুতুলের মত কাজ করছে মৌয়ের হাত পা, কিন্তু ব্রেইন সিগন্যাল যেন আটকে আছে ঋভুর আকুতি ভরা শেষ কথায়...
“তোমাকে খুব মিস করছি তো...”
ওর কাছে ঋভু হচ্ছে একটা অবসেশন। একটা অদ্ভুত মায়া।
যে মায়া গভীর রাতে শান্ত হয়ে আসা ব্যস্ত এই শহরের রাস্তা ধরে ছুটে চলা গাড়ির তীব্র শব্দে সম্বিত ফিরিয়ে দেয়...
যে মায়া তামাটে চোখের তারার অব্যক্ত ভালোবাসায় নিজেকে এক খোলসের আবরণে বন্দী করে ফেলে...
মৌয়ের কাছে ঋভু আসলে একটা নেশার নাম।
ভালোবাসার এতোগুলো দিন পরও যে নেশার ঘোর ওর আজও কাটেনি...
কম্পিউটারের পাশে রাখা নিজের ব্যাগটা টেনে নিল ও। চেইন খুলে সদ্য কেনা মানিব্যাগটা হাতে নিয়ে আঙ্গুল বুলিয়ে দেখল এক পলক। যেন ঋভুর ছোঁয়া অনুভব করছে ও মানিব্যাগের মধ্য দিয়ে...
ছোট্ট ছোট্ট এসব অনুভূতির নামই তো প্রেম...
৫
মীটিং আর টানা কাজ শেষ করে পৌনে ৮ টার দিকে অফিস থেকে বের হতে পারল ঋভু। যদিয়ও কাল আবার সকালে দৌড় আছে কপালে, কিন্তু ওটা নিয়ে এখন ভাবতে রাজি নয় ও। অফিসের চিন্তা অফিসে রেখেই বেরিয়ে পড়েছে...
এখন ফ্রি টাইম।
হাটতে হাটতে অফিসের সামনের মোড়ের দিকে চলে এলো ও। উদ্দেশ্য কিছু ছোট ছোট ছেলেপেলেকে খুঁজে পাওয়া। সারাদিন এরা এই সিগন্যালে বিভিন্ন ফুল বিক্রি করে।
আজ ও বেলি ফুল দেখেছিল যেন কার হাতে...
মৌয়ের খুব পছন্দের ফুল হচ্ছে বেলি। তবে অনেকের মত গলায় নয়, বরং ফুলের মালাটা হাতে পেঁচিয়ে পড়তে বেশি ভালোবাসে মেয়েটা। ঋভুর ইচ্ছে করছে মৌয়ের জন্য ফুল কিনতে...
এদিক সেদিক তাকাতে তাকাতে ভাগ্যক্রমে এক পিচ্চিকে পেয়ে গেল ও। দামদর না করে তিনটা মালাও কিনে ফেলল। এবার ফেরার পালা। বেশিক্ষণ অবশ্য অপেক্ষা করতে হল না ওকে। একটা সিটিং বাস দেখতে পেয়ে সেটায় চড়ে বসলো। তারপর অভ্যাসবশত হেডফোন কানে দিয়ে মৌয়ের রেডিও স্টেশন টিউন করল। এসময়টায় মৌ প্রোগ্রাম করে। সলো প্রোগ্রাম। আর নিজের বউ বলে নয়, আসলে মৌয়ের প্লে লিস্ট ঋভুর অলটাইম ফেভারিট। ঠিক এই মুহূর্তে মৌ গানে যাবার আগে কথা বলছে।
সেই মিষ্টি, প্রলম্বিত, স্নিগ্ধ কণ্ঠস্বর...
“......খুব প্রিয় একজন মানুষের জন্য এখন ডেডিকেট করব একটা গান। আমি বিশ্বাস করি সে এখন শুনছে আমাকে আর আমি ভাবছি তাকে... লিসেনারস !! গানটা হল আমি আছি তোমার অপেক্ষায় ফ্রম দ্য মুভি কাগজের বউ... শুনতে থাকুন, ফিরছি একটু পর... স্টে টিউনড !!”
এই গানটা মৌয়ের খুব প্রিয়। বহুবার শুনিয়েছে ও ঋভুকে। শুনতে শুনতে ঋভুরও ফেভারিট লিস্টে স্থান পেয়েছে গানটা। হেডফোনের অদৃশ্য ইথারে ভর করে গানের কথাগুলো এলোমেলো করে দিতে লাগলো ঋভুকে।
বাইরে ব্যস্ত শহরের নিয়ন আলোর কারসাজি, আর ভেতরে মৌয়ের প্লে করা গান...
“এখন তোমার স্বপ্নে আবার আটকে পড়েছি,
সামনেই আছো যদিয়ও...
এত দূরে নয়, অনেক কাছাকাছি,
দেখতে পাও কি তুমিও?
নাকি অন্য কোথাও মন তোমার বল,
এই ভিড়ের আড়ালে...
যেইসব রাস্তাঘাট শান্ত হল,
তুমি ফিরে গেলে...
আমি আছি যে তোমার অপেক্ষায়
সারাদিন অপেক্ষায়...
পৌঁছে যাব, একদিন তোমার ঠিকানায়
নির্দিষ্ট ঠিকানায়...”
এই ঠিকানার খোঁজেই তো থাকে ভালোবাসা।
সময় থাকতে কখনও কেউ খুঁজে পায়, কখনওবা পায় না...
“আমি হয়ত সেইসব ভাগ্যবানদের একজন” ভাবল ঋভু, “যার ভালোবাসা বেলিফুলের মালার মত সত্য, নরম ও পূর্ণ...”
৬
আজ একটু তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরেছে মৌ।
সাধারণত প্রোগ্রাম শেষ করে অফিসে একটু আড্ডা মাস্তি করে তারপর বাড়ি ফেরার অভ্যাস ওর। কিন্তু আজ সব বাদ। প্রোগ্রাম শেষ করেই ঊর্ধ্বশ্বাসে রওনা হয়েছে ও। ফেরার পথে অবশ্য একটা জায়গায় কিছু সময়ের জন্য থামতে হয়েছিল ওকে...
বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে একটু ভাবল ও। ঋভুর জন্য স্পেশাল কিছু একটা করার প্ল্যান ওর। কিন্তু কি করা যায়, এটা হচ্ছে প্রশ্ন। অনেক ভেবেচিন্তে শেষপর্যন্ত পছন্দের রান্না করার সিদ্ধান্তে পৌঁছল মৌ...
ঋভু খিচুড়ি খুব পছন্দ করে। সাথে অতি সাধারণ ডিম ভাজি, কাঁচা মরিচের আলু ভর্তা আর মুরগি থাকলে তো কথাই নেই। একদম ভরপুর।
ঘড়ি দেখতে দেখতে দ্রুত হাতে কাজ শেষ করে আনল মৌ। ঋভুর আসার সময় হয়ে গেছে প্রায়। এই ফাঁকে টেবিলে সবকিছু সুন্দর করে সাজিয়ে ফেলতে হবে। প্রেজেন্টেশনটা ভালো হওয়া জরুরী।
কলিং বেলের আওয়াজ পাওয়া গেল। এসে পড়েছে ঋভু। মৌ দরজা খুলে দিলে বরাবরের মত হাসিমুখে লিভিং রুমে প্রবেশ করল ঋভু। হালকা দুয়েকটা কথার পর বেডরুমে ঢুকে গেল । চেঞ্জ হতে হবে, ফ্রেশ হতে হবে। বাইরে আজকাল যা অবস্থা...
মৌয়ের মনটা একটু খারাপ হয়ে গেছে। ঋভুর হাত খালি। কাঁধে জাস্ট ব্যাগ।
“ও কি তাহলে ভুলে গেছে? নাকি অন্যকিছু?... উহু ! না, ওর তো ভুলে যাওয়ার কথা না... !” ভাবল মৌ। শ্রাগ করল আপন মনে, “কি জানি বাবা !! আচ্ছা যাই হোক, পরে দেখা যাবে... সময় তো আছেই...”
ডিনার টেবিলে টুকটাক কথাবার্তা। নর্মাল। অফিসে কে কি করল না করল, আজ কি হয়েছে হ্যান ত্যান। মৌয়ের মনে সুপ্ত আশা, ঋভু হয়ত প্রসঙ্গটা তুলবে। কিন্তু নাহ... কোন সম্ভাবনাই তো দেখা যাচ্ছে না।
মৌয়ের মনটা আরও খারাপ হতে লাগলো। মনে হয় আসলে ভুলেই গেছে... কাজের চাপ তো অনেক, তাই হয়ত...
কিন্তু মন কি মানে? সে যে বড় অবাধ্য...
ঘুমানোর আগে ডায়রি লেখার অভ্যাস দুজনেরই। কে কি লিখছে না লিখছে, সে ব্যাপারে অবাধ অ্যাক্সেসও আছে একে অপরের। ঋভু একটু আগে ডায়রি লিখছিল। মৌ নিজেরটা লিখতে এসে দেখল ঋভুর ডায়রির নিচে ছোট্ট একটা কাগজের টুকরা...
“কি ভেবেছ? আমি ভুলে গেছি?
জি না ম্যাডাম। দুনিয়া উল্টে গেলেও এই দিনগুলো ভুলবো না আমি। আর সবার কাছে যা খুশি তাই হলেও, আমার কাছে এই দিনগুলো স্পেশাল। যার শুরুটা আজ থেকে...
দিনটার নাম রোজ ডে। তাই খুব যত্ন করে কেনা গোলাপগুলো তোমার জন্য।
খেয়াল করনি হয়ত, তোমার ডায়রির পাশেই রাখা আছে। সাথে তোমার সবচেয়ে পছন্দের – বেলি ফুলের মালা।
খুশি তো এবার?”
মৌয়ের চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। মনে হয় কিছু পড়েছে চোখে... কিন্তু কোণগুলো একটু ভেজা বোধ হচ্ছে না?
একি সুখের কান্না? নাকি ভালোবাসার অনুভূতি?
হঠাৎ একটা গানের শব্দ শুনে থমকে গেল ও। যন্ত্রচালিতের মত পেছন ফিরতেই দেখতে পেল দরজার গায়ে হেলান দিয়ে ঋভু দাড়িয়ে।
সাউন্ড সিস্টেমে গানটা বাজছে...
খুব পরিচিত একটা গান...
ঋভুর পছন্দের...
দ্য ফরেইনারের ওয়েটিং ফর আ গার্ল লাইক ইউ...
“So long
I've been looking too hard, I've waiting too long
Sometimes I don't know what I will find
I only know it's a matter of time
When you love someone
When you love someone
I've been looking too hard, I've waiting too long
Sometimes I don't know what I will find
I only know it's a matter of time
When you love someone
When you love someone
It feels so right, so warm and true
I need to know if you feel it too
I need to know if you feel it too
Maybe I'm wrong
Won't you tell me if I'm coming on too strong
This heart of mine has been hurt before
This time I want be be sure
Won't you tell me if I'm coming on too strong
This heart of mine has been hurt before
This time I want be be sure
I've been waiting for a girl like you
To come into my life
I've been waiting for a girl like you
A love that will survive
I've been waiting for someone new
To make me feel alive
Yeah, waiting for a girl like you
To come into my life”
To come into my life
I've been waiting for a girl like you
A love that will survive
I've been waiting for someone new
To make me feel alive
Yeah, waiting for a girl like you
To come into my life”
৭
ডিনারের পর বারান্দায় গিয়ে বসলো ঋভু। আর মৌ গেল কিচেনে। কফি বানাবে। অনেকদিন পর আজ দুজনে মিলে গল্প করে কিছুটা সময় কাটাবে। কালও অবশ্য অফিস আছে।
কিন্তু তাতে কি আসে যায়...
শীত প্রায় শেষের দিকে। যদিয়ও রাতের এই সময়টায় হালকা ঠাণ্ডা বাতাস থাকে। বেশ ভালো লাগার মত। মৌয়ের কাছ থেকে কফির কাপটা হাতে নিয়ে তাতে ছোট্ট করে চুমুক দিল ঋভু।
নীরবতা ভেঙ্গে মৌয়ের প্রশ্ন –
- আচ্ছা, আমাকে প্রপোজ করার কথা মনে আছে তোমার?
- হঠাৎ এ কথা?
- দুম করে মনে পড়ল... আজ প্রপোজ ডে ছিল না...? বল না... !
- হুমমম ! মনে আছে তো !... একদম দাড়ি, কমা, সেমিকোলন, মিনিট, সেকেন্ড পর্যন্ত মনে আছে...
একটুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ মৌ বলে উঠলো –
- ঋভু... কেন আমাকেই প্রপোজ করেছিলে? আরও তো অনেকে ছিল...
কফিতে দীর্ঘ একটা চুমুক দিল ঋভু। কাপটা পাশে রেখে একটা সিগারেট ধরাল।
বুক ভরে ধোঁয়া ছেড়ে বলতে শুরু করল –
- হ্যাঁ। আরও অনেকেই ছিল... কিন্তু তোমার মত কেউ ছিল না।
দেখ মৌ... চলতি পথে বহুজনের সাথে দেখা হয়। কেউ হয়ত মনে রাখে, কেউবা রাখে না। আবার সবাইকে যে মনে জায়গা দিতে হবে তারও কোন কথা নেই। তোমাকে দেখে, তোমার কথা শুনে, তোমার সাথে থেকে, তোমার মনে জায়গা পাওয়ার ইচ্ছেটা খুব করে জেগেছিল আমার।
তাই অনেক ভেবেচিন্তে বলে ফেলেছিলাম কথাটা...
আমি জানতাম না তুমি কিভাবে নেবে বা উত্তর দেবে... আমি শুধু প্রার্থনা করছিলাম যাতে তুমি আমার হও...”
জোরে একটা টান দিয়ে সিগারেটটা ফেলে দিল ঋভু। থামল। চুপ করে বসে আছে মৌ। অখণ্ড নীরবতা। একদৃষ্টে মৌয়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হঠাৎ শুধাল ও –
- আচ্ছা... তুমি আমাকে হ্যাঁ বলেছিলে কেন?
আলতো করে কফিতে চুমুক দিল মৌ। রাতের শহরের বাড়িগুলোর আলো দেখা যাচ্ছে বিন্দু বিন্দু। বাতাসের বেগ বেড়েছে একটু...
ঋভুর দিকে একবার তাকিয়ে, কাপটা পাশে রেখে বলতে শুরু করল ও –
- তোমাকে আমি আমার খুব কাছের একটা ফ্রেন্ড ভাবতাম আসলে। যার সাথে সবকিছু শেয়ার করা যায়। অ্যান্ড আমি করতামও। লিটারেলি আমার সমস্ত খবর বলতাম তোমাকে। ভালো লাগা, মন্দ লাগা, মন খারাপ, গল্প, খাওয়াদাওয়া, গান – সব। এমনকি তোমার সাথে কথা না বললে ঘুমও আসতো না। কেমন যেন ফিল হত। ঠিক বোঝাতে পারবো না...
যেদিন তুমি প্রপোজ করলে, আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। মেনে নিতে পারছিলাম না প্রথমে। কেন, সত্যি বলছি আমি জানি না... কেন যেন মনে হচ্ছিলো যে তোমাকে তো আমি এভাবে কোনদিন দেখিনি। এই চোখে দেখিনি। কিন্তু তোমাকে ফিল করতে ভাল্লাগে আমার। তোমাকে পাশে পেতে ভাল্লাগে আমার। তাহলে এই অনুভূতির নাম কি...?
এই প্রশ্নের উত্তর পেতে দুই দিন লেগেছিল আমার...
বাকি গল্প তো আমাদের একসাথের...”
হাসল ও।
অনিন্দ্য সুন্দর মুখটার মিষ্টি হাসি দেখে ঋভুর ভেতরটা কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল...
এই হাসির জন্যই তো ওর সবকিছু।
এই মেয়েটার জন্যই তো ওর সব আয়োজন।
এমন হাসিমুখের মায়া ধরে রাখতে জীবনের শেষপর্যন্ত দেখে ছাড়তে পারে ও...
এইতো প্রেম।
ঋভু প্রেমে পড়ল আজ, আবার নতুন করে...
৮
ভালোবাসা আসলে কি? পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি করা প্রশ্নগুলোর মধ্যে এটা সম্ভবত একদম ওপরের দিকেই স্থান পাবে। কিন্তু উত্তরের বেলায়?
সম্ভবত সবচেয়ে বেশি রকমফের...
এখনকার দিনের ভালোবাসা অনেক বেশি বস্তুবাদী, শরীরবাদী। এটা খুব ভাল করে জানে ঋভু ও মৌ। তারপরও ওরা বেশ ভালই আছে, সুখে আছে। ছোটখাটো খুনসুটি নিয়ে সাজানো ওদের সংসারটা বেশ ঘটনাবহুল।
দৈনন্দিন জীবনের তুমুল ব্যস্ততাকেই ওরা ওদের মত করে কার্যকর বানিয়ে নিয়েছে...
ভালোবাসাটা ওদের কাছে কফির কাপের মত...
বাজারে প্যাকেটে কিনতে পাওয়া যায়, বানানোও সহজ। তবুও প্রিয় মানুষের নিজের হাতে পরিবেশনটা ভালোবাসার প্রতিরূপ।
ভালোবাসাটা ওদের কাছে স্পর্শের মত...
দূরত্ব যতই হোক, কাজের প্রেশার যতই থাকুক; মনের দিক থেকে খুব কাছে...
ভালোবাসাটা ওদের কাছে এক অব্যক্ত অনুভূতির নাম...
মাঝে মাঝে নীরব থেকেও যার প্রকাশ হয় শক্তিশালী; কোন কথা না বলে শুধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে থেকে...
ঝুম বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ফাঁকা শহরের ফুটপাথ ধরে হাটা অথবা,
রোডসাইড কোন এক ছোট্ট ফুচকার দোকানে দাড়িয়ে বেশি টক দিয়ে ফুচকা খাওয়া অথবা,
একটু বেশি সময় পাশাপাশি থাকার জন্য নাভিশ্বাস উঠিয়ে কাজ করেই বাড়ির দিকে ছুট দেয়া অথবা,
খুব মিস করার সময়ে ফোনের বড় স্ক্রিনে ভালোবাসার মানুষের ছবির দিকে অপলক তাকিয়ে থাকার আরেক নাম ঋভু – মৌয়ের প্রেম...
এটা ওদের ভালোবাসার ধরণ।
এটা ওদের যাপিত জীবনের ছায়া।
এটা ওদের কাছে থাকার গল্প...
Comments
Post a Comment