Skip to main content

হতাশার গল্প (২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে ফেসবুকে পাবলিশড)

কাচের টেবিলের ওপর অলস ভাবে পড়ে আছে অ্যান্টিকাটারটা। বহুল ব্যবহারে কিঞ্চিৎ জর্জরিত অবস্থা। ব্লেডেও হাল্কা মরচে ধরে আছে। দেখে মনে হচ্ছে এটা দিয়ে কোন কিছু কাটার চেয়ে বরং টিটেনাসের ভয়ই বেশি...
ডাইনিং টেবিলে বক্সে রাখা ফল কাটার ছুরিটা বেশ অদ্ভুত। শক্ত প্লাস্টিকের বাট। চওড়া বাঁকানো ফলা। এটা যে বেশ ধারালো তা খালি চোখেই বোঝা যায়...
গত কয়েক মিনিট ধরে অ্যান্টিকাটার আর ছুরিটার দিকে পালাক্রমে তাকাচ্ছি আমি। বোঝার চেষ্টা করছি ঠিক কোনটা দিয়ে বাম হাতের কব্জিতে প্রথম পোঁচটা দেব। আমি আবার ডানহাতি কি না...
আচ্ছা, নাকি ওই উচু বিল্ডিঙটার ছাদে চলে যাব?
তাতে অবশ্য প্যারা কম।
জাস্ট সাহস করে একটা লাফ... এরপর উড়তে থাকো আর উড়তে থাকো...
কে বাঁধা দেয় আর...
পালাতে বড্ড ইচ্ছে করছে হে...
আর পারি না...
ভ্যাপসা গরমের মাঝে একটু একটু করে নেমে আসছে সন্ধ্যা। মাগরিবের মায়াবী আজান ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। বাসার সামনের গলিতে মানুষের ইতস্তত চলাফেরা, কোলাহলের শব্দ একটু কমে এলো মনে হচ্ছে। রুদ্ধশ্বাসে দেখতে থাকা হলিউড মুভিটা এমন সময় শেষ হয়ে আসায় কান থেকে হেডফোন খুলে নিলাম আমি। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে...
পিসি টেবিলের পাশে পড়ে থাকা ফোনটা চেক করলাম। নাহ... কোন এসএমএস নেই। কোন ম্যাসেঞ্জার নোটিফিকেশনও নেই। কিচ্ছু না ! অবশ্য আশাও বা করছি কেন ! প্রচণ্ড অসহায়বোধটা আমাকে কুঁকড়ে দিচ্ছে। কিন্তু ভেতরের এই অস্থিরতা দেখার মত কেউ নেই...
গলা শুকিয়ে কাঠ। ঢক ঢক করে পানির বোতল থেকে সরাসরি অনেকখানি খেয়ে ফেললাম। বাসায় থাকতে ইচ্ছে করছে না। বাইরে যেতে হবে। একটু একা থাকতে হবে। একদম একা...
ঘন ঘন টানে তৈরি হওয়া সিগারেটের গভীর ধোঁয়ার আড়াল থেকে চায়ের কাপটার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছি আমি। কি দেখছি, নিজেও জানি না। কেমন যেন এক অদ্ভুত অবসাদ ঘিরে ধরছে আমাকে। চোখের ভেতরটা জ্বলছে। কিন্তু কিছু ভাবতে পারছি না আমি...
নিজেকে মনে হচ্ছে হঠাৎ পরাবাস্তবতায় আটকে পড়া এক ব্যর্থ গুড ফর নাথিং।
রিকশা থেকে নেমে ভাড়া দেয়ার টাইমে খেয়াল করলাম ভাংতি টাকা নেই। ওয়ালেট কাছিয়ে যা ছিল তাই দিয়ে ভাড়া মিটিয়ে দোকানে ঢুকে পড়লাম। ভ্যাঁপসা গরম আবহাওয়া। তবুও এটাই ভালো। বের তো হতে পেরেছি বাসা থেকে...
ধুমসে আড্ডা, খাওয়া আর চা সিগারেট চলছে। সাথে চায়ের কাপের টুংটাং আওয়াজ, মানুষের হরেক রকম কথার গুঞ্জরন, মাঝে মধ্যে হঠাৎ রিকশার বেল, বাইকের ইঞ্জিনের শব্দ ইত্যাদি মিলিয়ে জমজমাট অবস্থা। ঘড়ির দিকে তাকালাম আমি। বাসায় ফেরার সময় হয়ে আসছে। কিন্তু আমি তো চাইনা ফিরতে...
ওই একাকীত্বের মাঝে ব্যাপারটা যে আমাকে চরমভাবে গ্রাস করে। চারদিক থেকে কি একটা যেন আমাকে একদম অসহায় করে তোলে ! আমি পারি না পালাতে ! এর থেকে মুক্তি পাওয়ার যত চেষ্টাই করি না কেন... পারি না। কোনভাবেই না... !
যন্ত্রচালিতের মত ফোনটা তুলে নিলাম হাতে। কেমন করে কি থেকে যেন কি হয়ে গেল হঠাৎ ! সম্বিত ফিরে পেতেই দেখলাম টেক্সট করে ফেলেছি ! কিন্তু কেন করলাম কাজটা? কেন ! কেন !! কেন !!!
নিজেকে আসলে আবারো একটা খোলসে বন্দী করে ফেলতে হবে। কেউ যাতে সেই খোলসের ভেতরকার এই আমিকে আর বুঝে ফেলতে না পারে... নইলে বিপদ অবধারিত।
তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রির কাছাকাছি। হিউমিড ওয়েদার। প্রচণ্ড গরম। গাছের পাতা তো দূরে থাক, মাথার চুল পর্যন্ত নড়ছে না বাতাসে। রোদের রিফ্লেকশনে বাইরে রাস্তার দিকে তাকালে মনে হচ্ছে গরম উনুনের আঁচে পুড়ছে সবাই। ইতস্তত মানুষের হাঁটাচলা। কিছুটা কম। একান্ত বাধ্য না হলে এমন ওয়েদারে, তাও এই দুপুরে কেউ বের হয় না। আমিও অবশ্য বের হইনি। জানালার সাথের সিঙ্গেল সোফাটায় গা এলিয়ে বসে ধূমায়িত কফির কাপটার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছি। অনেকক্ষণ ধরে। কি ভাবা যায় সেটাই ভাবছি...
ক’দিন ধরে কিছু ব্ল্যাংক স্পেসে আটকে আছে আমার চিন্তা ভাবনা। কোন একটা ব্যাপার শুরু করেও কন্টিনিউ করার মত ইচ্ছেটা কাজ করছে না। কিন্তু গতরাতের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আলাদা। জানা, বোঝা আর মনে রাখার মাঝে আসলে কত ব্যবধান!
দেখুন, সত্য যতই নির্মম হোক না কেন, সত্য সত্যই। একে পরিবর্তন বা পরিবর্ধনের কিছু নেই। তবে মাঝে মাঝে সত্যের আঘাতে ভাবনার জগত কিছু সময়ের জন্য যেন পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়। কিছু বোঝার বা জানার মত স্বাভাবিক ক্ষমতাও তখন লোপ পায়। আমার ব্যাপারটাও অনেকটা সেরকম।
তবে জানেন তো, ক্ষমতা লোপ পায় কিন্তু আবার নতুন করে ফিরে আসার জন্য...
সময় বদলায়। রঙ বদলায়। হিসেবের খাতাও বদলায়। তেমনি আজ আমিও বদলেছি। আগের চেয়ে একটু বেশি। আসলে জীবন বিদ্যালয়ের শিক্ষা মাঝে মাঝে আমাদেরকে অন্য আরেক রাস্তা দেখায়। আর চয়েস ইজ আওয়ারস, যে আমরা কোনদিকে যাব...
এখনকার মত না হয় গেলাম অন্য বাঁকে। আর শেষটা না হয় না লেখাই থাকুক...

Comments

Popular posts from this blog

কৃষ্ণরঙিন (২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ফেসবুকে পাবলিশড)

১ গভীর নিদ্রা থেকে দুম করে চোখ খুলে গেল অঞ্জনের। প্রতিদিন ঠিক এ সময়েই ঘুম ভাঙ্গে ওর। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এটা ঘটে কোনরকম তাগিদ দেয়ার আগেই, যেন অনেকটা দম দেয়া পুতুলের মত... নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই যা করার করতে হবে। কিছুক্ষণ আড়মোড়া ভেঙ্গে সোজা হয়ে উঠে বসে অঞ্জন। সদ্য ঘুম ভাঙ্গার কারণে যদিয়ওবা কিছুটা স্লো মুভমেন্ট, তারপরও রুটিন মাফিক বেশ কিছু কাজ ওকে করতেই হবে... কিচ্ছু করার নেই। স্যান্ডাল জোড়া বরাবরের মত বিছানার নিচের দিকে হারিয়ে গেছে। বেশ কসরত করে সেগুলোকে উদ্ধার করে পায়ে গলিয়ে তাতে ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারলো অঞ্জন। আলস্যকে ঝেড়ে ফেলার প্রাণপণ চেষ্টা করতে করতে ফ্রেশ হতে এগিয়ে গেল ও। আজ ম্যালা কাজ আছে ওর। চকলেট কিনতে হবে, র‍্যাপিং করতে হবে, কার্ড বানাতে হবে... আরও কত্ত কি! হাতমুখ ধুয়ে ডাইনিং টেবিলে চলে এলো ও। ভালো মতই জানে যে মা সবকিছু একদম রেডি করে রেখেছেন। ওর কাজ হচ্ছে জাস্ট একশন। আই মিন খাওয়াটা সেরে ফেলা। তারপর ব্যাগ নিয়ে সুন্দর মত বেরিয়ে যাওয়া... ইদানিং একটু আগেই বের হতে হয় অবশ্য। উন্নয়নের স্রোতের ঠ্যালায় বাসার ঠিক সামনের রাস্তা আবার কাটা কিনা! তাই রিকশা, সিএনজি কিচ্ছু পাওয়া যা...